Bangla বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার মুসলিম সমাজে শ্রেণি রূপান্তর

Authors

  • Dr. Roushan Ara Afrous Author

Abstract

দেশ বিজয়, ধর্মপ্রচার ও স্থানীয় জনগণের ধর্মান্তরিতকরণ, জন্মসূত্রে ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে বাংলার নবাবের পরাজয়ের ফলে বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় হতে মুসলমানেরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হতে থাকে। ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষার স্কুলে ইংরেজিকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। পলাশীর যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত বাংলার সার্বভৌম ক্ষমতা মুসলমানদের হাতে থ্যকায় প্রথমদিকে মুসলমানেরা ইংরেজ শাসন ও ইংরেজি শিক্ষা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে। ফলে শাসন ক্ষমতা থেকে শুরু করে বিচার, রাজস্বসহ সকল বিভাগে মুসলমানদের স্থান সংকুচিত হয়ে পড়ে। এসময় ইংরেজ শাসন ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিবেশী হিন্দু সমাজে নব্য জমিদার ও ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হয় যারা নিজেদের ইংরেজ শাসনের সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার মুসলিম সমাজও ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে। ফলে মুসলিম সমাজে একটি ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হতে থাকে। এরাই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সভা-সমিতি গঠন করে মুসলিম সমাজে জাগরনের সৃষ্টি করে। বিশ শতকে এ শ্রেণি সচেতন মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক চেতন্যর সৃষ্টি হয়। আধুনিক সমাজে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে সমাজ বিন্যাসে আমূল পরিবর্তন আসে। আধুনিক শিক্ষা, আর্থিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাই বিশ শতকে মুসলিম সমাজবিন্যাসের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করতে থাকে। এ শতকের শেষার্ধে ব্যঙালি মুসলিম সমাজ একটি নতুন পরিচয়ে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়ায়। বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার মুসলিম সমাজে যে শ্রেণি রূপান্তর ঘটেছে সে সম্পর্কে আলোচনার একটি প্রয়াস এ নিবন্ধটি।

সামাজিক শ্রেণি নিরূপন করা হয় মূলত আর্থিক মাপকাঠিতে। সামাজিক শ্রেণিসমূহ হচ্ছে এক একটি বাস্তব গোষ্ঠী, যাদের আইনানুগ ও ধর্মীয়ভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না এবং এসব এভাবে অনুমোদিতও নয়। এগুলো আপেক্ষিকভাবে মুক্ত, বন্ধ নয়। বলা যায় এসবের ভিত্তি অর্থনৈতিক, কিন্তু এগুলো নিছক অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর চেয়েও ব্যাপক (সেন, ১৯৯৭: ৭)। প্রাচীন বাংলার সমাজ যেমন বিভিন্ন বর্ণে তেমনি বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। সামাজিক ধনের উৎপাদন ও বন্টনানুযায়ী সমাজে অর্থনৈতিক শ্রেণির উদ্ভব ও স্বরভেদ দেখা দেয়। যে সমাজের উৎপাদিত ধনের উপর সকলের সমান অধিকার, ব্যক্তিগত ধনাধিকার যে সমাজে স্বীকৃত নয়, সেই সমাজে শ্রেণিবিন্যাসের প্রশ্ন অবান্তর (রায়, ১৪০০: ২৬১)। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, অর্থনীতি বা আর্থিক মানদন্ডই শ্রেণিবিন্যাসের অন্যতম মাপকাঠি। লেনিন এর মতে, 'Classes are large groups of people differing from each other by the place they occupy in a historically determined system of social production, by their relation (in most cases fixed and formulated by law) to the means of production, by their role in the social. organization of labour and consequently, by the dimensions of the share of social wealth of which the dispose and the mode of acquiring it. Classes are groups of people one of which can appropriate the labour of another owing to the different places they occupy in a definite system of social economy', ম্যাকস ওয়েবারের মতে, 'The term class satus will be applied to the typical probability that a given state of a. Provision with goods, b. External conditons of life and c. Subjective satisfaction or frustration will be possessed by an individual or a group', সংজ্ঞা অনুযায়ী কোন বিশেষ অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সামাজিক সম্পদের কত অংশের ওপর দখল কায়েম করতে পেরেছে বা পারে নি, তারই ভিত্তিতে সমাজে সেই ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর 'শ্রেণি মর্যাদা' নির্ণীত হয় (ইসলাম, ১৯৯৪: ৫৮-৬০)। শ্রেণি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণার নিমিত্তে বলা যায় যে, শ্রেণি হল একটি আধুনিক অর্থনৈতিক সংজ্ঞা যা নতুন উৎপাদন পদ্ধতি বিকাশের কারণে আত্মপ্রকাশ করে থাকে। সুতরাং এটা বলা যায় যে, একটি শ্রেণিগঠন প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক কার্যকলাপ মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। শ্রেণি নানা ধরণের হতে পারে। যেমন- occupational, industrial, social, ideo-political-economic and income classes (ভূইয়া, ২০০২:১০)। পলাশীর যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত বাংলার শাসন ক্ষমতা অভিজাত মুসলমানদের হাতে ছিল, তাই দীর্ঘদিন তারা ইংরেজ শাসনকে মেনে নিতে পারেনি। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানী লাভের পর রাজস্ব বিভাগেও ব্রিটিশদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংরেজ কর্তৃক ১৭৯৩ সালে স্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের দ্বারা পূর্বেকার ভূমি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করা হয়। এই ব্যবস্থার সাথে 'সূর্যাস্ত আইন' যুক্ত করায় পুরনো হিন্দু ও মুসলমান জমিদারী নব্য হিন্দু বিত্তবানদের হাতে চলে যায় (আহমদ, ১৯৯৭: ২৯-৩১)। অন্য দিকে উত্তরাধিকার আইনের ফলে মুসলমানদের জমিদারী ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ায় এককালের জমিদার কয়েক দশকের ব্যবধানে ভূমি-কৃষকে পরিণত হয় (Report on the Census of India, 1901: 442)। ১৮২৮ সালের 'নিস্কর ভূমি বাজেয়াপ্ত আইনে' এসব সম্পত্তির অধিকাংশ মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায় এবং বহু সম্ভ্রান্ত পরিবার দরিদ্র বা ধ্বংস হয়ে যায় (আহমদ, ১৯৯৭: ৩২)।  ১৮৩৫ সালে সরকারি প্রশাসনে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। ১৮৪৪ সালে চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগ পদ্ধতির পরিবর্তন করা হয়। মুসলমানগণ দুর্ভাগ্যবশত বাংলার পরিবর্তিত শাসনব্যবস্থার উপযোগী করে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে নি। ইংরেজি শিক্ষা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে আরবি ও ফারসি শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় ইংরেজি শিক্ষার ফলে উদ্ভুত নানা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মুসলমানগণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে সম্ভ্রান্ত ও উচ্চ পরিবারের মুসলমানগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বেশি (রাব্বী, ১৯৬৮: ১৫০-১৫২)। কৃষক, শ্রমিক, তাঁতী অর্থাৎ বিত্তহীন নিম্ন শ্রেণিও কোম্পানির এ শোষণ থেকে রেহাই পায় নি (আহমদ, ১৯৯৭: ৩৩)। এ ঘটনাসমূহ মুসলমানদেরকে সমাজের উচ্চতর স্তর থেকে একেবারে নিম্নতর স্তরে ঠেলে দেয় (করিম, ১৯৯৯: ২৯৪)। ইংরেজি শিক্ষা থেকে দূরে থাকায় মুসলিম সমাজে নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হয়। ইংরেজগণ ক্রমে ক্রমে সমগ্র দেশব্যাপী একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। পাশ্চাত্য বিদ্যা শিক্ষা পদ্ধতির আমদানি, বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে শিক্ষক-অধ্যাপক শ্রেণির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া বিভিন্ন পেশাদার অপেশাদার বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উদ্ভব হয়। ভারতীয় শহরগুলোতে প্রধানত সরকারি ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী প্রভৃতি বুদ্ধিজীবীর সমন্বয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে (আহমদ, ১৯৯৭: ৪২)। কোম্পানি কর্তৃক শাসনভার গ্রহনের পর কলকাতা রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। কলকাতার আদর্শেই দেশের মফঃস্বল শহরগুলোতে মধ্যবিত্তের বিকাশ হয়। গ্রামাঞ্চলে ভূমির সাথে সম্পৃক্ত ভূস্বামী, তালুকদার, পত্তনিদার, গাঁতিদার, জোতদার, দাদনদার, মহাজন ও জমিদারী আমলা নিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণি পূর্ব থেকেই ছিল। ব্যবসায়িক, পেশাগত এবং ভূমি সম্পৃক্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এ তিনটি ধারা আধুনিক মধ্যবিত্তের প্রধান উপাদান। তবে ইংরেজদের সহযোগিতায় যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয় তা প্রধানত প্রশাসনিক চাকরি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে (Misra, 1961: 5-12) উনিশ শতকেও বাংলার মুসলিম সমাজ 'আশরাফ' (উচ্চ বংশীয়) এবং 'আতরাফ' (নিম্ন বংশীয়) এই দু'টি শ্রেণি নামে পরিচিত ছিল (ভূইয়া, ১৯৯৫: ২৫)। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার মুসলিম সমাজ নতুন পথে যাত্রা করে। পাশ্চাত্য বিদ্যা ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করায় মুসলমান সমাজে নব চেতনা জাগ্রত হয় (আহমদ, ১৯৯৭: ৪৪)। মুর্শিদাবাদে মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত নিজামত কলেজে এবং হাজী মুহম্মদ মহসীনের দানে স্থাপিত হুগলী কলেজে ইংরেজি শিক্ষালাভের সুযোগ ছিল (আনিসুজ্জামান, ২০০১: ৪৩)। কলকাতা মাদ্রাসায় ১৮২৯ সালের দিকে ইংরেজি ক্লাশ খোলা হলেও ইংরেজি পড়ার ব্যয় সংকুলানের ক্ষমতা মুসলমান ছাত্রদের ছিল না (মল্লিক, ১৯৮২: ২০৬)। আর্থিক সঙ্গতির অভাবে বাঙালি মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ে। ১৮৫১ সাল পর্যন্ত কলকাতা মাদ্রাসা থেকে দুই জন নবাব আব্দুল লতিফ ও ওয়াহিদ্‌স্টননবী এবং হুগলী কলেজ থেকে মুসা আলী ও ওয়ারিস আলী জুনিয়র স্কলারশীপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন (আনিসুজ্জামান, ২০০১: ৪৩-৪৪)। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে কিছু সংখ্যক মুসলমান উপলব্ধি করতে পারেন যে, আধুনিক শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার অর্থই হল মুসলমান সমাজের পশ্চাৎপদ অবস্থাকে পাকাপোক্ত করা। নবাব আব্দুল লতিফ এবং সৈয়দ আমীর আলী এ সময় শিক্ষা আন্দোলন শুরু করেন (আহমদ, ১৯৯৭: ৫০)। এই সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে মুসলমান ছাত্র দেখা যায়। তারা বিভিন্ন সংঘ গড়ে তোলেন। যেমন: মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি, সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান এসোসিয়েশন ইত্যাদি (জোয়ারদার, ১৯৮৬:১২)। ১৮৫৫ সালে শ্রীরামপুরের সন্নিকটে দেশের প্রথম পাটকল স্থাপিত হলে, উত্তর ও পূর্ব বাংলার পাটের তৈরী হস্তশিল্প ধ্বংস হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৭৯-৮০ সাল থেকে পাট উৎপাদন ও পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, ফলে পাটকলের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং মুসলিম চাষীদের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সূচনা হয় (ভূইয়া, ১৯৯৫: ৭৪-৭৫)। ১৮৫৩ সালে রেলপথ চালু হয় যার সম্প্রসারনের কাজ ১৯০০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল (বাংলাপিডিয়া, ২০১১: ২২৭-২২৮)। উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে বাংলায় মুসলিম সাংবাদিকতার (সৈয়দ আবদুল রহিমের 'বালারঞ্জিকা', কাজী আবদুল খালেকের 'মোহাম্মদী আখবার', এম, নাসিরুদ্দীন আহমদের 'সোলতান', শেখ ফজলুল করিমের 'বাসনা', মোঃ নাসির উদ্দীনের 'সওগাত' প্রভৃতি) গোড়াপত্তন হয় (ভূইয়া, ১৯৯৫: ১১৭-১১৯)। এরা পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা এবং সভা-সমিতির মাধ্যমে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তা ছিল বাংলার মুসলমানদের জন্য ধর্মগত ও সমাজগত দিক দিয়ে আত্মচেতনা ও নবজাগরণ লাভের আন্দোলন (আহমদ, ১৯৯৭: ৩৭৯)। যার ফলে বাংলার মুসলিম সমাজ থেকে অজ্ঞতা, অন্ধবিশ্বাস, গোঁড়ামী, কুসংস্কার প্রভৃতি হ্রাস পেতে থাকে। আর ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে আধুনিক শিক্ষা ও সভ্যতার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। এই শিক্ষিত শ্রেণি ক্রমেই রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠে। তাঁরা মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করে বিভিন্ন সংগ্রামে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। এই সব পত্র-পত্রিকায় ব্রিটিশ শাসন, ইংরেজি শিক্ষা, হিন্দু ও কংগ্রেসের প্রতি বুদ্ধিজীবী সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী ফুটে ওঠে (দে, ২০১১: ১৪৮)। উনিশ শতকের শেষ দশকে ও বঙ্গভঙ্গের আগে বাঙালি মুসলমান বা উঠতি চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে হঠাৎ করে নিজেদের পশ্চাৎপদ অবস্থা সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠতে দেখা যায়। তৎকালীন বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্যতম জীবিকা চাকরি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার অন্যান্য ক্ষেত্রে হিন্দুদের তুলনায় পশ্চাৎপদতা তাদের ক্রমেই নিজেদের দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিল। এ চিন্তা একদিকে যেমন নিজেদের অতীত ভ্রান্তি সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তুলেছিল অন্যদিকে তেমনি নিজেদের বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিপরীতে পৃথক সত্তা হিসাবে প্রকাশ করার চেষ্টা দেখা যায়। বঙ্গভঙ্গের ফলে হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বদেশী আন্দোলন এই বিভেদ দ্রুত স্থায়ী করে তোলে। কারণ বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ বিপরিতমুখী হয়ে দাঁড়ায়। ১৯০৫ সালে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই বিভক্তি বাংলার সাম্প্রদায়িক খণ্ডনের সূচনা ঘটায় যা ১৯৪৭ সালে বাস্তব রূপ নিয়েছিল (রহমান, ১৯৭৮: ১৪২)। বঙ্গভঙ্গ পূর্ব মুসলমান সমাজ তেমন সংহত ছিল না। এ সমাজে যেমন বিচ্ছিন্নতা ছিল তেমনি ছিল শ্রেণি বৈষম্য। জেলা গেজেটিয়ারের লেখকদের বর্ণনায় দেখা যায়, আশরাফ বা উচ্চবংশীয় মুসলমানগণ শারীরিক শ্রমকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত এবং তারা স্থানীয় মুসলমানদেরকে আজলাফ বা 'নিম্ন জীবনমাত্রার জনগোষ্ঠী' বলে মনে করত।  ১৯০৫ সালের আগে বাংলার গ্রাম এবং মফস্বল শহরগুলিতে যে মুসলমান এলিট গোষ্ঠীগুলির বাস ছিল, তাদের সাথে মুসলমান কৃষক, শ্রমিক কিংবা অন্যান্য নিম্নবর্গভুক্ত লোকদের তুলনায় হিন্দু এলিটদেরই মিল ছিল অনেক বেশি। নীরদচন্দ্র চৌধুরী বঙ্গভঙ্গপূর্ব সময়ে ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ শহরে তার ছোট বেলার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- 'পূর্ব বাংলায় (সাম্প্রদায়িক) বিদ্বেষের স্থান ছিল না মুসলমানদের সংখ্যার কারণে। তদুপরি এরাও ছিল বাংলা ভাষী। দু'সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন ছিল একই সূত্রে গ্রথিত। আমাদের গলিতে বেশ কয়েকজন মুসলমান উকিল ছিলেন। তাঁদের আমরা আমার পিতার অন্যান্য সহকর্মীর মতই শ্রদ্ধা করতাম। তাঁদের কিংবা তাঁদের ভাইয়ের ছেলেদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব ছিল প্রতিবেশী অন্য হিন্দু ছেলেদের মতোই' (ম্যাকলেন, ২০০৭: ১২৪-১২৫)। উনিশ শতকের শেষে কিছু কিছু বড় ও ছোট মুসলিম জমিদারদের জমিদারী তাঁদের অকর্মণ্যতার জন্য হিন্দু আমলাদের হাতে চলে যায়। উনিশ শতকের শেষে ও বিশ শতকের শুরুতে জমি হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে জমিতে হিন্দুদের মালিকানাস্বত্ব বৃদ্ধি পেলেও স্বদেশী ও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে পূর্ব বাংলার কৃষি অর্থনীতিতে অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এই সময় শিক্ষিত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির হিন্দুদের তুলনায় শিক্ষিত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মুসলমানরা অনেকটা সংগঠিত হয়ে নিজেদের দাবী-দাওয়া প্রকাশ করতে থাকেন। বিত্তের অধিকারী মুসলমানেরা জমি-জমায় টাকা লগ্নী করে নিজেদের সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হন (দে, ২০১১: ১৬২)। পূর্ব বাংলা পাট চাষের ও পাটের বাজারের প্রধান কেন্দ্র ছিল। বিশ শতকের গোড়ার দিকে পূর্ব বাংলায় ৩৬টি পাটকল ছিল। অবশ্য পাটশিল্পের প্রায় একচেটিয়া মালিকানা ছিল ব্রিটিশ পুজিপতিদের হাতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এদেশীয় মাড়োয়ারি সম্প্রদায় বাংলার পাটশিল্পে আকৃষ্ট হয় (মুখোপাধ্যায়, ১৯৯১: ১২২)। বিশ শতকের প্রথমার্ধে রপ্তানি দ্রব্য হিসাবে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এই পাট চাষ ও পাট ব্যবসাকে ভিত্তি করে এক শ্রেণির সম্পন্ন মুসলিম কৃষক ও ব্যবসায়ীর আবির্ভাব হয়। এই সময়ে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম শ্রেণির প্রসারণ ও আত্ম-প্রতিষ্ঠার সূত্রপাত ঘটে। সরকারি চাকরি, ওকালতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জমিজমায় অর্থলগ্নীর মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রসারণ হয়। মুসলিম জমিদার, জোতদার, মধ্যস্বত্বভোগী ও মহাজনদের সংখ্যা কম হলেও জমি হস্তান্তরের ফলে অপেক্ষাকৃত অর্থবান মুসলমানেরা জমিতে বিভিন্ন মালিকানাস্বত্ব লাভ করেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুসলিম স্বার্থ রক্ষার্থে 'মুসলিম চেম্বার অব কমার্স' এক বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এ শতকেই মুসলমানেরা বুঝতে পারেন যে, সরকারি চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দুরা (দে, ২০১১: ১৬৩)। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার পর পূর্ব বাংলার বিভাগ, জেলা এবং মহকুমা দপ্তরগুলিতে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের পদসমূহে মুসলমানদের নিয়োগের হার ছিল ছয় ভাগের এক ভাগেরও কম (ম্যাকলেন, ২০০৭: ১৩০)।

১৮৭২ এর পরবর্তী আদমশুমারীতে মুসলমানদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। এসময়ের মধ্যে পূর্ব বাংলার বগুড়া, রাজশাহী, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, পাবনা, বাখরগঞ্জ, ত্রিপুরা ও ময়মনসিংহ জেলায় মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের থেকে অনেক বেশি ছিল। মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ মুসলমানদের আত্মসচেতনতা ও আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভে অনুপ্রাণিত করে (দে, ২০১১: ১০৩)। ১৯২১ সালের আদমশুমারীর রিপোর্ট বাঙালি মুসলমানদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে, সেগুলোর মধ্যে আশরাফ ছিল সংখ্যালঘু শ্রেণি। এই রিপোর্টে বেহারা (পালকি বাহক), জোলা (তাঁতী), কলু (ঘানিতে তেল প্রস্তুত কারক), নিকারি (মৎস্য বিক্রেতা) এদের আতরাফ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর পাঠান, শেখ ও সৈয়দগণকে আশরাফ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করে (Report on the Census of India, Bengal, Part-1, 1921: 374) ১৮৫৩ সালে রেলপথ স্থাপনের পর থেকে বিভিন্ন শিল্পের সূচনা ও বিকাশ হতে থাকে। যেমন: পাটকল, সুতার কল (১৯০৬-১৯১৫ সালের কমলা মিল, নারায়নগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও বাগেরহাটের কাপরের কল), কয়লার খনি (পূর্ব বাংলায় ১৯০৫ সালে ২৪৬টি, ১৯২৪-২৫ সালে ২৫০টি, ১৯৩৪-৩৫ সালে ১৮৪টি কয়লার খনি ছিল) প্রভৃতি (মুখোপাধ্যায়, ১৯৯১: ১২০, ১২৫)। অর্থনৈতিক কাঠামোর এই মৌলিক পরিবর্তনে নতুন সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস গড়ে ওঠে। স্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট ভূমিস্বত্বভোগী জমিদার শ্রেণি ও রায়ত শ্রেণির পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে বড় ও ছোট জোতদার, ক্ষেতমজুর, ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণির সৃষ্টি হয়। এছাড়া শহরাঞ্চলে পুঁজিপতি, শিল্পপতি ও বণিকশ্রেণি, শ্রমিকশ্রেণি, ছোট-বড় ব্যবসায়ী এবং চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক ও সাংবাদিক প্রভৃতি বৃত্তিভোগী শ্রেণির সৃষ্টি হয় (ঘোষ, ১৩৫৫: ৪৭-৪৮)। নবগঠিত এই শ্রেণির হাতেই বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি সম্ভবপর হয়। উনিশ শতকের শেষে ও বিশ শতকে নতুন ভূমি ব্যবস্থা (বঙ্গীয় প্রজাসত্ত্ব আইন) এবং ইংরেজ শাসনের ফলে যে নতুন শ্রেণিবিন্যাস গড়ে উঠে তা হিন্দু-মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের সৃষ্টি করে, তাকে প্রতিহত করার মত কোন শক্তিশালী সংগঠন ছিল না। বিশ শতকের প্রথম থেকেই এই শ্রেণিবিন্যাস ও শ্রেণি বৈষম্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি করে। পঞ্চাশের মনন্তর এই শ্রেণিবিন্যাসের পট পরিবর্তনে সহায়তা করে। এই দুর্ভিক্ষের ফলে দরিদ্র ব্যক্তিরাই নিঃস্ব ও দুঃস্থ হয়। দুর্ভিক্ষের আঘাত দরিদ্র শ্রেণির উপরই পড়ে (দে, ২০১১: ১৬২-১৬৩)। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় মফঃস্বলে এক শ্রেণির লোকের হাতে মোটা টাকা সঞ্চিত হয়। ঐ সময়ই মজুদদারী, কালোবাজারী ও চোরচালান স্বাভাবিক ব্যবসায়ের অনুসঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় (সেন, ১৯৯৭: ১০২)। যাদের জমিজমা ও অন্য কোন সম্পদ ছিল, সেই ধরণের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষতিগ্রন্থ হয় নি। আর উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা দুর্ভিক্ষের ছোঁয়াচ থেকে ছিলেন মুক্ত বরং তারা এ সময়ে আরো বিত্তশালী হয়ে ওঠেন (দে, ২০১১: ১৬৩-১৬৪)।  ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত কলকাতার হিন্দু সমাজ ইংরেজদের সহায়ক শক্তি হিসাবে সাফল্যজনকভাবে ভূমিকা পালন করেছে। বঙ্গীয় মুসলিম সমাজে নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী, সৈয়দ আমীর হোসেন প্রমুখ ব্যক্তির নেতৃত্বে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটে। বিশ শতকের প্রথম দুই দশক বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে সংঘটিত বঙ্গভঙ্গ, স্বদেশী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ রদ, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রভৃতি ঘটনা এ অঞ্চলের জনমনে গভীর রেখাপাত করে। যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। এই সময়ে মুসলিম সমাজের নেতৃত্বেও পরিবর্তন সূচিত হয় (হোসেন, ১৯৯৩: ১)। ১৯০৫ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসের আন্দোলন মূলত প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সব সরকারি পদে নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এই দুটি দাবীর একটির প্রতিও অভিজাত মুসলমানদের সমর্থন ছিল না। কারণ তখন সম্পত্তি এবং করদানের পরিমাণের উপর ভোটদানের অধিকার নির্ভর করত। ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কারের পরও মোট জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম লোকের ভোটাধিকার ছিল। মুসলমানদের মধ্যে অবস্থাপন্ন লোকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাই বাংলার মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মুসলমান ভোটদাতার সংখ্যা ছিল নগন্য। ইংরেজি শিক্ষায়ও মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। হিন্দু প্রতিযোগীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগীতায় অবতীর্ণ হয়ে তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। তাই অভিজাত মুসলমানরা হিন্দুদের সঙ্গে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন না করে নিজেদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত ছিল (ইসলাম, ১৪১২: ২০৮-২০৯)।

১৯০৫ সালে 'পূর্ব বাংলা ও আসাম' নামে সৃষ্ট নব গঠিত প্রদেশে মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাজেই সেখানে তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর মুসলমানদের একটি প্রতিনিধিদল সিমলায় বড় লার্ট লর্ড মিন্টোর সঙ্গে দেখা করে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন প্রথা এবং বিশেষ গুরুত্বের দাবী করে। এই প্রতিনিধিদলে বাংলার নওয়াব আলী চৌধুরী এবং এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন। সলিমুল্লাহ নওয়াব আলী চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর প্রস্তাবিত সর্বভারতীয় মুসলিম সংগঠনের পরিকল্পনার খসড়া পাঠিয়েছিলেন। ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলমান নেতারা মিলিত হয়ে 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ' গঠন করে। মুসলিম লীগ বঙ্গভঙ্গ সমর্থন এবং বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে (ইসলাম, ১৪১২: ২১২)। পরবর্তীতে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হবার পর ১৯১২ সালে বাংলা প্রদেশকে যেভাবে পুনর্গঠিত করা হয় তাতে প্রদেশে মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় বেশি দাঁড়ায়। কিন্তু শিক্ষায়, সরকারি চাকরিতে, ব্যবসায়-বাণিজ্যে, জমিদারীতে, মহাজনী কারবারে, ওকালতি প্রভৃতির মত লাভজনক পেশায় হিন্দুরা এই নেতৃত্ব হাতছাড়া করতে কোন মতেই রাজী ছিল না। সেই জন্যই তাঁরা সব সরকারি চাকরিতে সরাসরি প্রতিযোগীতার মাধ্যমে নিয়োগের দাবী করতেন। কারণ তাহলে সরকারি চাকরিতে তাদের একাধিপত্য বজায় থাকে। সেই জন্যই তাঁরা রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে মেশালেও, হিন্দুদের একটা জাতি ভাবলেও এবং অনেক সময়ই শুধুমাত্র হিন্দুদের মঙ্গলচিন্তা করলেও হিন্দু-মুসলমান সকলের নেতৃত্ব দাবী করতেন (ইসলাম, ১৪১২: ২৩৬)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এতদ্বঅঞ্চলের মুসলিম উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ঘটনা। পূর্ব বাংলা দরিদ্রতা ও সুযোগের অভাবে উচ্চশিক্ষা থেকে পিছিয়ে ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুসলমান ছাত্ররা ক্রমাগতভাবে অধিক হারে বি. এ. ও এম. এ. পাশ করে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, ওকালতি সহ নানা পেশায় নিয়োজিত হতে থাকে। এভাবে ১৯৪৭ সালের দিকে পূর্ব বাংলায় একটি শিক্ষিত, রাজনৈতিক ও সমাজ সচেতন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয় (Rahim, 1981: 178)। ১৯২৩ সালের বেংগল প্যাক্ট পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের কিছু সুযোগ সৃষ্টি করলেও বাস্তবে তা কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে বাস্তবায়িত হতে পারেনি। ১৯৩৭ সাল থেকে প্রজা-লীগ মন্ত্রিসভার আমলে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি আরো প্রসারিত ও সংহত হয়। সরকারি চাকরিতে ও অন্যান্য বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত শিক্ষিত মুসলমানদের সংখ্যা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। অর্থ, সম্পদ ও শিক্ষায় উন্নত মুসলমানেরা আরো বেশি আত্ন-সচেতন হন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় একটানা দীর্ঘকাল প্রজা-লীগ মন্ত্রিসভা বাংলার শাসনতন্ত্র পরিচালনা করায় উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলমানেরা দ্রুত সমগ্র পরিবেশকে নিজেদের অনুকূলে আনতে সক্ষম হন। কৃষকের দুর্দশা লাঘবে ভূমি ব্যবস্থার কোন আমূল পরিবর্তন না হওয়ার ফলে এই শ্রেণির (উচ্চ ও মধ্য) মুসলমানদের পক্ষে সমগ্র বাঙালি মুসলমানদের উপর প্রভাব বিস্তার করা এবং হিন্দুদের নিকট থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে এক স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হয় (দে, ২০১১: ১৬২-১৬৪)।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী অর্থনৈতিক সংস্কার, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষা সম্প্রসারণ, ১৯২৬ ও ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভক্তি, হিন্দু-মুসলমানদের স্থানান্তর অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী ঘটনাবলী মুসলিম সমাজকে নতুন ভাবে গঠনের ক্ষেত্রে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে। ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা আলাদা প্রদেশ হওয়ার পর থেকেই এর জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্রতা বেশি মাত্রায় লক্ষ করা যায়। ধর্ম ভিত্তিক বিভাজন পরবর্তীতে ভাষার প্রশ্নেও দেখা দেয়। ইতোমধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন (১৯৪৯ সাল) ও বিভিন্ন মুসলিম সভা-সমিতি গঠনের ফলে পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজে নব চেতনা লক্ষ করা যায়। যার প্রেক্ষিতে বিশ শতকের মুসলিম সমাজ নতুন ভাবে বিন্যস্ত হতে দেখা যায়। অষ্টাদশ শতকে বংশভিত্তিক স্তরায়ণে কৌলিণ্য বজায় রাখার প্রথা লোপ পেতে থাকে এবং বিশ শতকে আর্থিক মাপকাঠি, ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাগ্রহণ ও রাজনৈতিক সচেতনার ভিত্তিতে উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন শ্রেণির গঠন হতে থাকে (দে, ২০১১: ১৬২)। উনিশ শতকের শেষদিকে বাংলার শহুরে জীবন ও শিল্প অর্থনীতিতে চরম অবনতি ঘটে। এর প্রতিক্রিয়া গ্রাম ও শহরের সমাজ বিন্যাসে অনুভূত হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতিমালার কারণে শহরে নিয়োজিত শ্রমিকরা শিল্প ছেড়ে নেহাত জীবীকার জন্য গ্রামে গিয়ে কৃষকে পরিণত হয় (সেন, ১৯৯৭: ৬৯)।বিশ শতকের গোড়ার দিকে সামন্ততান্ত্রিক শরীফ পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটার কারণে তারা বিত্তবান শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনে আগ্রহী হয়। এতে ক্রমশ বিলীয়মান বংশকৌলিণ্য ও উদীয়মান বিত্তকৌলিণ্যের ভেতর একটা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর এ প্রক্রিয়া অধিকতর গতি সঞ্চার করে (সেন, ১৯৯৭: ৭৭)। নিম্নশ্রেণিভুক্ত মুসলমানও বিশ শতকে এসে অর্থবিত্ত লাভ করেন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার ফলে অভিজাত শ্রেণির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন।  একটি প্রবাদ আছে, Last year I was a Jolaha, this year I am a Sheikh (Report on the Census of India, Part-1, 1901: 441). বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে সৈয়দ, মোগল, শেখ ও পাঠান এ চার গোষ্ঠীর মধ্যে 'পাঠান' পদবিটি বাংলাদেশের বাখরগঞ্জ ও ঢাকা জেলায় খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জনসংখ্যা রিপোর্টের তথ্য মতে, The numbers who retumed themselves as Pathans increased from 215, 982 in 1901 to 280, 898 in 1911, the increased being greatest in the Dacca Division, where 87,220 were returned in 1911 against only 54,371 in 1901; this number rose to 122, 146 in 1921. Similarly the number of Syeds in Dacca and Rajshahi Divisions also significantly increased. The numbers of Syeds in Dacca and Rajshahi were 24,362 and 16,112 respectively in 1901, but they increased to 34,377 and 26,706 respictively, in 1921 (Report on the Census of India, Bengal, Part-II, 1921: 330-367). ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে বিশ শতকের সূচনালগ্নে ১৯০৫ সালে প্রথমবার বাংলা বিভক্তির ফলে চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রদান করায় পূর্ব বাংলায় একটি শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠিত হয় যা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও নেতৃত্ব দান করে। এই শ্রেণি কোন কোন অর্থে পূর্ব বাংলার মুসলিম উচ্চ শ্রেণির চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মুদ্রাস্ফীতির কারণে এ শ্রেণি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অন্যদিকে যুদ্ধ পরবর্তী নতুন বণিক শ্রেণি তাদের অর্থবিত্ত ও প্রতিপত্তির জোড়ে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে (করিম, ২০১২: ৯৯)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পূর্ব বাংলা প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার প্রভাব, বিশ্বযুদ্ধের অনুসঙ্গী মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব, দ্বিতীয় বাংলা বিভক্তি (১৯৪৭) পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান সমাজ বিন্যাসের প্রকৃতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। মুসলিম সমাজে এ যাবৎ পর্যন্ত যে নতুন ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণি এবং বিভিন্ন ধরণের পেশাজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণি অনুপস্থিত ছিল, দ্বিতীয় বাংলা বিভক্তির সাথে সাথে পূর্ব বাংলা থেকে হিন্দু শ্রেণিগুলোর বাস্তুত্যাগের ফলে সৃষ্ট শুন্যতা পূরণ করতে সেসব শ্রেণি দ্রুত গঠিত হয়। ১৯৪৭ এর পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা আলাদা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এবং মুসলিম-হিন্দু শ্রেণির বাস্তুত্যাগ প্রভৃতি কারণে পূর্ব বাংলার শহরে মুসলিম জনসংখ্যা হঠাৎ বৃদ্ধি পায় (করিম, ২০১২: ৯৮)। রংগলাল সেনের মতে, ব্রিটিশ শাসনের শেষ দশকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলার উচ্চ শ্রেণিতে উচ্চ জাতিবর্ণভুক্ত হিন্দুদের চেয়ে মুসলিম সমাজভুক্ত উচ্চস্তরের লোকের হার অর্ধেকের চেয়ে সামান্য বেশি ছিল। কারণ ঐ সময় বাংলার শহুরে ও গ্রামীণ সম্পদের আশি ভাগের মালিক ছিল উচ্চ শ্রেণির হিন্দুরা। ১৯৪৭ সালে যখন পাক-ভারত বিভক্ত হয়ে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হল তখন এর কৃষি সমাজ বা গ্রামীণ সমাজ কাঠামোয় চারটি প্রধান শ্রেণি লক্ষ করা যায়। ক) গুটিকয়েক মুসলিম বড় জমিদারসহ বৃহৎ জমিদারদের একটি ক্ষুদ্র প্রভাবশালী গোষ্ঠী, খ) হিন্দু ও মুসলিম উভয় সমাজের ভেতর প্রায় সমানভাবে বিভক্ত ছোট জমিদার, জোতদার ও ধনী কৃষকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, গ) মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বয়ংসম্পূর্ণ মালিক কৃষকের একটি বিরাট শ্রেণি এবং ঘ) হিন্দু ও মুসলিম উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় সমভাবে বন্টিত এক বিপুল সংখ্যক গরীব কৃষক, বর্গাদার ও ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক। আর ঐ সময়ে পূর্ব বাংলার শহুরে সমাজ কাঠামোর মধ্যে রয়েছে একদিকে একটি ক্ষুদ্র বুর্জোয়া ও সর্বহারা শ্রেণি এবং অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষিত পেশাদারী ও চাকরিজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত এক বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মুসলিম সামন্ত জমিদার ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সুপ্রতিষ্ঠিত অংশ নিয়ে ১৯০৬ সালে স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ এবং ১৯২৯ সালে মুসলিম জোতদার, তালুকদার, ধনী কৃষক ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দুর্বলতার অংশ নিয়ে ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টির ন্যায় বাংলার রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম সমাজের স্বরবিন্যাসে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ১৯৩৭ এবং ১৯৪৬ সালের বাংলার বিধান সভার নির্বাচনে এ দল দুটি মুসলিম বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভোটে জয়লাভ করার মাধমে যথাক্রমে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটাতে থাকে (সেন, ১৯৯৭: ৭৮-৮০)। পাকিস্তান আমলে হিন্দু উচ্চ বর্গের পূর্ব বাংলা ত্যাগের ফলে বাঙালি গ্রামীণ মুসলিম জোতদার ও ধনী কৃষক ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। শহরাঞ্চলে উঠতি বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রভাবশালী অংশ শহুরে সম্পত্তি, ব্যবসা ও শিল্পের মালিক হয়।

এভাবে ধনসম্পত্তি হস্তান্তরের ঘটে। পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার সমাজে নগরায়নের আরেকটি তাৎপর্য হল সেখানকার শহুরে মুসলিম সমাজে 'শরীফ' ও 'শরীফ নয়' শ্রেণির ভেতর সনাতন সামাজিক দূরত্ব ক্রমশ লোপ পায়। এর ফলে এমন নতুন সমাজ কাঠামোর বিকাশ ঘটে যেখানে আয়, সম্পদ ও পেশাগত মর্যাদা সামাজিক স্তরবিন্যাসের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সৃষ্টি হয় আইনজীবী, অধ্যাপক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রভাবশালী বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি (সেন, ১৯৯৭: ৮৭) একদিকে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কারণে সামন্ততান্ত্রিক 'শরীফ' গোষ্ঠীর অবনতির ফলে বাঙালি মুসলিম অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর ভেতর সামাজিক দুরত্ব ক্রমশঃ হ্রাস পায় (Karim, 1980: 137-138)। এ পর্যায়ে একাধিক বাঙালি মুসলিম ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত পরিবারের সাথে উঠতি ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপিত হয় (সেন, ১৯৮১: ১৪৫)। রাজনৈতিক দলগুলোতে পূর্বে যে ভূমিনির্ভর উচ্চবিত্তদের প্রাধান্য ছিল তা ইংরেজি শিক্ষিত পেশাজীবীদের দ্বারা পরিবর্তিত হয়। এর ফলে ঢাকা, দেলদুয়ার, করটিয়া, ধনবাড়ি জমিদার পরিবারের নেতৃত্ব সংকুচিত হয়ে যায়। এ.কে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল মনসুর আহমদ, আব্দুর রহিম, সামসুদ্দীন আহম্মদ, আজিজুল হক, কামরুদ্দীন আহমদ, আবুল কাশেম, আবুল হাশিম প্রমুখ পেশাজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেন (Broomfield, 1968: 44-60)।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ৪৩-এর মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭ এর দেশভাগ সমাজকে নতুনভাবে সাজাতে সাহায্য করে। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা উত্তর বাংলায় পর পর ক্ষমতার হাতবদল, বিভিন্ন অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, শহর ও গ্রামাঞ্চল হতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানী, অর্থলগ্নী প্রথা সৃষ্টি, ভূমিহীন শ্রেণির সংখ্যা বৃদ্ধি প্রভৃতি ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৪ সালে উপজেলা হওয়ার পর থেকে নগরায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। নগরের অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করার ফলে জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তা ক্রমশই দরিদ্র কৃষক হতে নব্য ধনীদের হাতে পৌঁছায় (সেন, ১৯৯৭: ১০২)। এভাবে সমাজে অভিজাত শ্রেণি তৈরি হতে থাকে। যারা মূলত নব্য অভিজাত। উনিশ শতকে শিক্ষার মাধ্যমে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃষ্টি হয় সে শ্রেণিই বিশ শতকে এসে নেতৃত্ব গ্রহণ করে। এই শ্রেণি রূপান্তরে কোন বংশগত বা ধন-ঐশ্বর্যের প্রভাব ছিল না। শিক্ষা গ্রহণ ও ব্যক্তিগত বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা এই শ্রেণিকরণের প্রধান মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।

সুত্র নির্দেশ:

  • আনিসুজ্জামান। মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য। ঢাকা: প্রথম প্যাপিরাস সংস্করণ, ২০০১।
  • আহমদ, ওয়াকিল। উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানদের চিন্তা ও চেতনার ধারা। ১ম পুনর্মুদ্রণ, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯৭।
  • ইসলাম, নজরুল। বাংলায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক। পঞ্চম মুদ্রণ, কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, ফাল্গুন ১৪১২।
  • ইসলাম, শহিদুল। সমাজ কাঠামো ও সমাজ পরিবর্তন। সমাজ নিরীক্ষণ-৫৩। ঢাকা: ১৯৯৪ (বিস্তারিত দেখুন, V. L. Lenin,
  • Collected Works, Moscow: Vol. 29, Cited in Andrel Zdravomyslov's Articles, p. 74; Max Weber, An Intellectual Portrait", New York: 1962, p. 326.) 1
  • করিম, আব্দুল। বাংলার ইতিহাস (১২০০-১৮৫৭ খ্রিঃ)। ঢাকা: বড়াল প্রকাশনী, ১৯৯৯।
  • করিম, এ. কে. নাজমুল। পরিবর্তনশীল সমাজ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। অনুবাদ: রংগলাল সেন, জিনাত হুদা অহিদ এবং শিশির ঘোষ, পুনর্মুদ্রণ, ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২।
  • ঘোষ, বিনয়। বাংলার নবজাগৃতি। কলকাতা: ১৩৫৫।
  • জোয়ারদার, সফিউদ্দীন। বাংলার নবজাগৃতি: পুনর্বিবেচনা। সমাজ নিরীক্ষণ। ১৯ সংখ্যা, ঢাকা: ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬।
  • দে, অমলেন্দু। ব্যঙালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। ঢাকা: জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ২০১১।
  • ভূইয়া, ড. গোলাম কিবরিয়া। বাংলায় মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯৫।
  • ভূইয়া, ড. গোলাম কিবরিয়া। বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি। প্রথম প্রকাশ, ঢাকা-চট্টগ্রাম: এ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ২০০২।
  • মল্লিক, ডক্টর আজিজুর রহমান। বৃটিশ নীতি ও বাংলার মুসলমান (১৭৫৭-১৮৫৬)। দিলওয়ার হোসেন অনূদিত, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৮২।
  • মুখোপাধ্যায়, সুবোধ কুমার। বাংলার আর্থিক ইতিহাস, বিংশ শতাব্দী (১৯০০-১৯৪৭)। প্রথম প্রকাশ, কলকাতা: কে পি বাগচী অ্যা কোম্পানী, ১৯৯১।
  • ম্যাকলেন, জন আর,। বঙ্গবিভাগ, ১৯০৫: রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭০৪-১৯৭১), ১ম খণ্ড, তৃতীয় সংস্করণ, ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ফেব্রুয়ারি ২০০৭ (মাঘ ১৪১৩)।
  • রাব্বী, খন্দকার ফজলে। বাংলার মুসলমান। মু. আব্দুর রাজ্জাক অনূদিত, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৬৮।
  • রহমান, আসহাবুর। উনিশ শতকে মুসলিম মানস ও আধুনিক শিক্ষা। সমাজ নিরীক্ষণ। প্রবন্ধ পত্রিকা-১, ঢাকা: নভেম্বর ১৯৭৮।
  • রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙ্গালীর ইতিহাস আদিপর্ব। প্রথম দে'জ সংস্করণ, কলকাতা: দে'জ পাবলিশিং, বৈশাখ ১৪০০।
  • সেন, রংগলাল। বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো: ঐতিহাসিক পটভূমি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, চতুর্দশ সংখ্যা, ঢাকা: ডিসেম্বর

            ১৯৮১ (পৌষ ১৩৮৮)।

  • সেন, রংগলাল। বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস। প্রথম পুনর্মুদ্রণ, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, জুন ১৯৯৭ (আষাঢ় ১৪০৭)।
  • হোসেন, ইমরান। বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবী: চিন্তা ও কর্ম। ১ম প্রকাশ, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯৩।
  • বাংলাপিডিয়া। খণ্ড-১২, দ্বিতীয় সংস্করণ, ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০১১।
  • Broomfield, J.H. Elite Conflict in a Plural Society. Barkeley: 1968,
  • Karim, A. K. Najmul. The Dynamics of Bangladesh Society, Dacca: Nawrose Kitabistan, 1980.
  • Misra, Dr. B. B. The Indian Middle Class, London: Oxford University Press, 1961.
  • Rahim, M. A. History of the University of Dacca. Dacca: 1981.
  • Report on the Census of India. Vol-IV, 1901.
  • Report on the Census of India. Vol-VI, Part-I (Report), 1901.
  • Report on the Census of India. Bengal, Vol-V, Part-1 (Report), 1921.
  • Report on the Census of India. Bengal, Vol-V, Part-II (Tables), 1921.

Published

2025-11-24